এস. এম. জাকির হোসাইন
সাংগঠনিক সম্পাদক, রায়পুর প্রেসক্লাব
কর্মব্যস্ত জীবনের একঘেয়েমি দূর করতে এবং সহকর্মীদের সঙ্গে কিছু আনন্দঘন মুহূর্ত কাটাতে ঐতিহ্যবাহী রায়পুর প্রেসক্লাবের উদ্যোগে আমরা যাত্রা করি বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে। আনন্দ, উচ্ছ্বাস, বন্ধুত্ব ও প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে ভরা এই ভ্রমণ আজও হৃদয়ের গহীনে অমলিন স্মৃতি হয়ে আছে।
রায়পুর থেকে একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসে আমাদের যাত্রা শুরু হয়। রাতভর পথচলার পর ভোরের আলো ফুটতেই পৌঁছে যাই কক্সবাজারের ডলফিন মোড়ে। দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি থাকলেও সমুদ্রের কাছে পৌঁছানোর আনন্দে সবাই ছিল উচ্ছ্বসিত। হোটেলে উঠে কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে সকালের নাস্তা শেষ করেই ছুটে যাই সমুদ্রসৈকতে।
সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ গায়ে লাগার অনুভূতি যেন ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। বিশাল জলরাশি, দূর দিগন্তে আকাশ আর সমুদ্রের মিলন, আর ঢেউয়ের গর্জন আমাদের মুগ্ধ করে। সহকর্মীদের সঙ্গে সমুদ্রস্নান, ছবি তোলা, হাসি-আনন্দ আর খুনসুটিতে সময় কেটে যায় চোখের পলকে। মনে হচ্ছিল, জীবনের সব ক্লান্তি যেন সাগরের জলে ভেসে যাচ্ছে।

স্নান শেষে হোটেলে ফিরে গোসল ও দুপুরের খাবার সেরে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিই। বিকেলে আবার সমুদ্রের টানে বেরিয়ে পড়ি। সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ছিল, তখন সোনালি আলোয় সমুদ্রসৈকতের রূপ যেন আরও মোহনীয় হয়ে ওঠে। ঢেউয়ের অবিরাম গর্জন আর শীতল বাতাস মনকে এক অন্যরকম প্রশান্তিতে ভরিয়ে দেয়।
পরদিন সকালে শুরু হয় কক্সবাজারের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার পর্ব। আমরা ঘুরে দেখি বিমানবন্দর এলাকা, যেখানে সমুদ্রের খুব কাছেই অবস্থিত বিমানবন্দরটি এক ভিন্ন অভিজ্ঞতার জন্ম দেয়। এরপর যাই মাছঘাটে। সেখানে সমুদ্র থেকে ধরা নানা প্রজাতির মাছের পাইকারি ও খুচরা বিক্রির ব্যস্ত দৃশ্য আমাদের মুগ্ধ করে। জেলেদের কর্মব্যস্ততা এবং মাছের বিশাল সমাহার ছিল সত্যিই দেখার মতো।
ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ ছিল শুঁটকি পল্লী পরিদর্শন। সেখানে গিয়ে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয় কীভাবে সমুদ্রের মাছ সংগ্রহ করে শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করা হয়। শুঁটকি তৈরির পুরো প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করে আমরা নতুন এক অভিজ্ঞতা অর্জন করি। স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানারও সুযোগ হয়।
আমাদের হোটেলের সামনে থেকে অটোরিকশায় করে আমরা চলে যাই হিমছড়ির পথে। মেরিন ড্রাইভের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য উপভোগ করতে করতে পৌঁছে যাই হিমছড়ি ঝর্ণায়। পাহাড়ের বুক চিরে নেমে আসা ঝর্ণার জলধারা, শীতল বাতাস আর চারপাশের সবুজ প্রকৃতি আমাদের হৃদয় জয় করে নেয়। এরপর ঘুরে আসি পাটুয়ার টেক থেকে, যেখানে দাঁড়িয়ে একসঙ্গে সমুদ্র ও পাহাড়ের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করা যায়। প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এ যেন এক স্বর্গীয় স্থান।
তবে এই সফরের সবচেয়ে মুগ্ধকর অংশ ছিল মেরিন ড্রাইভ ভ্রমণ। পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর এই সড়কপথে চলতে চলতে মনে হচ্ছিল আমরা যেন প্রকৃতির আঁকা কোনো জীবন্ত চিত্রপটের মধ্যে প্রবেশ করেছি। একপাশে গর্জনরত নীল সমুদ্র, অন্যপাশে সবুজ পাহাড়ের সারি এ যেন প্রকৃতির এক অনন্য সৃষ্টি। আল্লাহর সৃষ্টির এমন অপরূপ মহিমা নিজের চোখে না দেখলে উপলব্ধি করা কঠিন। সৃষ্টিকর্তার অসীম কুদরতের সামনে মানুষ সত্যিই বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে যায়।

পুরো সফরজুড়ে সহকর্মীদের আন্তরিকতা, বন্ধুত্ব ও আনন্দঘন পরিবেশ ভ্রমণকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া, ঘোরাঘুরি, গল্প-আড্ডা আর স্মৃতিবন্দি করা অসংখ্য মুহূর্ত আজও মনে পড়ে।
দুই দিনের এই ভ্রমণ শেষে আমরা স্লিপার বাসে করে ফিরে আসি আমাদের প্রিয় জন্মভূমি রায়পুরে। কিন্তু কক্সবাজারের উত্তাল ঢেউ, সমুদ্রের গর্জন, সূর্যাস্তের সোনালি আভা, মেরিন ড্রাইভের মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য, হিমছড়ির শীতল পরশ এবং সহকর্মীদের সঙ্গে কাটানো আনন্দময় সময় আজও হৃদয়ে গেঁথে আছে।
ভ্রমণ মানুষকে শুধু আনন্দই দেয় না, দেয় নতুন অভিজ্ঞতা, নতুন উপলব্ধি এবং নতুন করে বেঁচে থাকার প্রেরণা। কক্সবাজার সফর আমাদের জন্য তেমনই এক অনন্য স্মৃতি, যা সময়ের পরিক্রমায় কখনোই ম্লান হবে না।
সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ সোহেল আলম
নির্বাহী সম্পাদক : মোঃ হারুনুর রশিদ
ব্যাবস্থাপনা সম্পাদক : এস এম জাকির হোসাইন
যুগ্ম সম্পাদক : তানভীর হাসান
মোবাঃ 01811-605212, 01763-592492, 01826-406770
ই-মেইল - dailydeshjournal@gmail.com
সম্পাদকীয় কার্যালয় : জনতা সুপার মার্কেট-২য় তলা, মেইন রোড, রায়পুর, লক্ষ্মীপুর।