সোমবার, ৮ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

শিরোনাম

‎শিক্ষা নয়, সুশিক্ষা প্রয়োজন ‎

‎শিক্ষা নয়, সুশিক্ষা প্রয়োজন

‎আমরা ছোটবেলা থেকেই একটি বহুল প্রচলিত কথা শুনে আসছি “পানির অপর নাম জীবন।” কিন্তু বাস্তবতা হলো, সব পানি জীবন রক্ষা করতে পারে না; জীবন রক্ষা করে বিশুদ্ধ পানি। ঠিক তেমনি, শুধু শিক্ষা অর্জন করলেই একজন মানুষ প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠে না। একজন মানুষকে মানবিক, বিবেকবান ও দায়িত্বশীল করে তোলে সুশিক্ষা।

‎আজকের সমাজে শিক্ষার হার বেড়েছে, ডিগ্রিধারী মানুষের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে কি মানবিকতা, নৈতিকতা ও পারিবারিক মূল্যবোধ বেড়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমরা অনেক সময় হতাশ হই।

‎উল্লেখ্য, গত রোববার (৩১ মে২০২৬)দেশের গণমাধ্যমে একটি হৃদয়বিদারক সংবাদ প্রকাশিত হয়। ঢাকার মিরপুর-১১ নম্বরের একটি বাসা থেকে ৭৫ বছর বয়সি বৃদ্ধা নুরজাহান বেগমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ কল পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে দরজা ভেঙে তার মরদেহ উদ্ধার করে। উদ্ধারকালীন মরদেহটি পচে গিয়ে পোকায় ধরেছিল এবং ঘরজুড়ে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বাসাটি অত্যন্ত নোংরা ও অগোছালো অবস্থায় ছিল।আরও বেদনাদায়ক বিষয় হলো, ওই মায়ের সন্তানরা সবাই উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত। একজন যুগ্ম সচিব, একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং আরেকজন বিদেশে, কানাডায় বসবাস করেন। কিন্তু শিক্ষিত সেই সন্তানদের কেউই নিয়মিত মায়ের খোঁজ নিতেন না।

‎এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের নয়; এটি আমাদের সমাজের নৈতিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। কারণ এখানে শিক্ষার অভাব ছিল না, অভাব ছিল সুশিক্ষার।

‎আমরা প্রায়ই দেখি, সমাজে অনেক মানুষ আছেন যারা উচ্চশিক্ষিত নন, কেউ হয়তো স্বল্পশিক্ষিত, কেউ হয়তো নিরক্ষর। কিন্তু তারা বাবা-মায়ের সেবা করেন, তাদের সুখ-দুঃখের খোঁজ রাখেন, পরিবারের দায়িত্ব পালন করেন এবং মানবিক মূল্যবোধকে ধারণ করেন। অন্যদিকে অনেক উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি সমাজে সম্মানজনক অবস্থানে থেকেও পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্ববোধ থেকে বিচ্যুত হন।

‎এর কারণ কী?

‎কারণ শিক্ষা মানুষকে জ্ঞান দেয়, কিন্তু সুশিক্ষা মানুষকে বিবেক দেয়। শিক্ষা মানুষকে পেশাগত দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করে, কিন্তু সুশিক্ষা শেখায় কীভাবে একজন ভালো মানুষ হতে হয়। শিক্ষা একজনকে চাকরি, পদ-পদবি ও অর্থনৈতিক সফলতা এনে দিতে পারে, কিন্তু সুশিক্ষা ছাড়া সে সফলতা অনেক সময় মানবিকতার শূন্যতায় পরিণত হয়।

‎আজ সমাজে যত অনৈতিক কর্মকাণ্ড, দুর্নীতি, প্রতারণা, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা পারিবারিক অবক্ষয়ের ঘটনা দেখা যায়, তার বড় একটি অংশ ঘটাচ্ছে শিক্ষিত মানুষরাই। কারণ তাদের ডিগ্রি আছে, কিন্তু নৈতিক শিক্ষা নেই; জ্ঞান আছে, কিন্তু বিবেকের চর্চা নেই।

‎শিক্ষার প্রকৃত সৌন্দর্য ডিগ্রিতে নয়, বিবেকে। বিবেকহীন শিক্ষা সমাজের জন্য আশীর্বাদ নয়, বরং অভিশাপ। একজন মানুষ কত বড় কর্মকর্তা, শিক্ষক, ব্যবসায়ী বা পেশাজীবী হলেন, সেটি গুরুত্বপূর্ণ নয়; গুরুত্বপূর্ণ হলো তিনি কতটা মানবিক, কতটা দায়িত্বশীল এবং কতটা নৈতিক।

‎রাষ্ট্র ও সমাজের আজ সবচেয়ে বড় প্রয়োজন কেবল শিক্ষিত জনগোষ্ঠী নয়, সুশিক্ষিত জনগোষ্ঠী। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে যেন নতুন প্রজন্ম শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল নয়, মানবিক মূল্যবোধও অর্জন করতে পারে। সন্তানদের শেখাতে হবে বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব, মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা, সততা, ন্যায়বোধ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা।

‎কারণ একটি জাতি শুধু ডিগ্রিধারী মানুষ দিয়ে উন্নত হয় না; উন্নত হয় সুশিক্ষিত মানুষ দিয়ে। শিক্ষা সভ্যতা গড়ে, আর সুশিক্ষা গড়ে মানবতা। তাই সময়ের দাবি একটাই শিক্ষা নয়, সুশিক্ষা প্রয়োজন। কারণ সুশিক্ষাই পারে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রকে ইতিবাচকভাবে বদলে দিতে এবং একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও কল্যাণমুখী সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে।


‎লেখকঃএস.এম জাকির হোসাইন
‎সংবাদকর্মী, সমাজকর্মী, সেচ্ছাসেবী

দেশ জার্নাল বাংলাদেশ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো।

[TheChamp-FB-Comments]

----- সংশ্লিষ্ট সংবাদ -----