শুক্রবার, ৩রা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

শিরোনাম

হায়দারগঞ্জ: রায়পুরের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র, ‎

‎এস.এস জাকির হোসাইন

‎লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার নাম উঠলেই যে জায়গাটির কথা সবার আগে মনে আসে, সেটি হলো হায়দারগঞ্জ। ঐতিহ্য, ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি উৎপাদন, ধর্মীয় সংস্কৃতি ও শিক্ষা বিস্তারের এক অনন্য সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই জনপদ আজ রায়পুরের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত। গ্রামের আবহ, মানুষের পরিশ্রম আর কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির সমন্বয়ে হায়দারগঞ্জ আজ শুধু একটি বাজার নয়, বরং একটি অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নাম।

‎লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলার দ্বিতীয় বৃহত্তম ও ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্যকেন্দ্র হলো হায়দারগঞ্জ বাজার। শতাব্দী প্রাচীন এই বাজারটি শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্যই নয়, বরং ধর্মীয় ঐতিহ্য, শিক্ষা ও বৃহৎ বার্ষিক ইসলামী সমাবেশের জন্য পুরো নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর অঞ্চলে অত্যন্ত পরিচিত ও সম্মানিত।

‎মেঘনা নদীর তীরবর্তী অঞ্চল হওয়ায় প্রাচীনকাল থেকেই নৌ-পথে যোগাযোগের অন্যতম কেন্দ্র ছিল এই এলাকা। আশেপাশের জেলা ও উপজেলাগুলোর মধ্যে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পাইকারি ও খুচরা কেনাবেচার স্থান হিসেবে গড়ে উঠেছে। আজও দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা হায়দারগঞ্জে এসে পণ্য সংগ্রহ করেন।

‎রায়পুরের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হচ্ছে নারিকেল, সুপারি, সয়াবিন, পান ও ধান। আর এই প্রতিটি খাতেই হায়দারগঞ্জের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। বিশেষ করে নারিকেল ও সুপারির জন্য রায়পুরের সুনাম দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। রায়পুরের নারিকেল সুস্বাদু, মিষ্টি ও মানসম্মত হওয়ায় এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এই নারিকেল দিয়ে তৈরি হয় নানান ধরনের পিঠা, নাড়ু ও মুখরোচক খাবার। বৃহত্তর নোয়াখালীর নারিকেলের মধ্যে রায়পুরের নারিকেলকে আলাদা করে চেনেন ক্রেতারা।

‎সুপারির ক্ষেত্রেও রায়পুর একটি পরিচিত নাম। স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে দেশের বিভিন্ন জেলায় রপ্তানি হয় এখানকার সুপারি। কৃষকের পরিশ্রম আর ব্যবসায়ীদের উদ্যোগে এই সুপারি ব্যবসা আজ বহু মানুষের জীবিকার উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।

‎বর্তমানে রায়পুরের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় অর্থকরী ফসল হচ্ছে সয়াবিন। দেশের মোট সয়াবিন উৎপাদনের বড় একটি অংশ আসে এই অঞ্চল থেকে। প্রতি মৌসুমে হায়দারগঞ্জ বাজারে কোটি কোটি টাকার সয়াবিন কেনাবেচা হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকাররা এখানে এসে সয়াবিন সংগ্রহ করেন। সয়াবিন থেকে তৈরি হয় গবাদিপশুর খাদ্য, পোল্ট্রি ফিড, বিস্কুটসহ নানা খাদ্যপণ্য। পুষ্টিগুণে ভরপুর এই ফসল স্থানীয় অর্থনীতিকে যেমন সমৃদ্ধ করছে, তেমনি কৃষকদের জীবনমানেও আনছে ইতিবাচক পরিবর্তন।

‎গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী পান চাষেও হায়দারগঞ্জের সুনাম রয়েছে। প্রতি শনিবার ও বুধবার হায়দারগঞ্জ বাজারে বসে জমজমাট পানের হাট। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা এসে এখান থেকে পান কিনে নিয়ে যান। অল্প পুঁজিতে অধিক লাভ হওয়ায় অনেক কৃষক পান চাষে ঝুঁকছেন। ব্যবসায়ীদের মতে, এই বাজারে প্রতিদিন কোটি টাকার পান বিক্রি হয়।

‎ধান উৎপাদনেও পিছিয়ে নেই রায়পুর। এখানকার উর্বর জমিতে উৎপাদিত ধান স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে দেশের বিভিন্ন মিল ও ফ্যাক্টরিতে সরবরাহ করা হয়। কৃষিনির্ভর এই অর্থনীতি হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে।

‎হায়দারগঞ্জ শুধু অর্থনৈতিকভাবেই নয়, ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাজারের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঐতিহাসিক হায়দারগঞ্জ তাহেরিয়া আর এম  কামিল মাদ্রাসা ও তাহেরিয়া  জামে মসজিদ এবং সাইয়েদ মঞ্জিল এই অঞ্চলের ইসলামি শিক্ষা ও ধর্মীয় সংস্কৃতির অন্যতম কেন্দ্র। প্রতি বছর শীতকালে এই মাদ্রাসা মাঠে অনুষ্ঠিত হয় দেশের অন্যতম বৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী ঈসালে সওয়াব ও সীরাতুন্নবী (সা.) মাহফিল। দেশের খ্যাতিমান আলেম-ওলামাদের উপস্থিতিতে এই মাহফিলকে ঘিরে লাখো মানুষের সমাগম ঘটে, যা হায়দারগঞ্জকে আধ্যাত্মিক মর্যাদায় বিশেষ অবস্থানে নিয়ে গেছে।

‎এছাড়াও হায়দারগঞ্জে রয়েছে একটি কলেজ, একটি গার্লস কলেজ, একটি গার্লস মাদ্রাসাসহ শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ফলে শিক্ষার আলোয় আলোকিত হচ্ছে নতুন প্রজন্ম।

‎মেঘনা নদীর সুস্বাদু ইলিশের জন্যও হায়দারগঞ্জ মাছ বাজারের আলাদা পরিচিতি রয়েছে। প্রতিদিন এখানে বিপুল পরিমাণ মাছ কেনাবেচা হয়, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

‎ভৌগোলিক দিক থেকেও হায়দারগঞ্জ একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। পশ্চিম ও উত্তরে চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলা এবং পূর্ব দিকে ফরিদগঞ্জ উপজেলার সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য এটি একটি কৌশলগত কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে।

‎সব মিলিয়ে বলা যায়, হায়দারগঞ্জ শুধু একটি বাজার নয়; এটি রায়পুরের অর্থনীতির হৃদস্পন্দন। কৃষক, ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের পরিশ্রমে প্রতিদিন সচল থাকে এই জনপদের অর্থনীতির চাকা। সম্ভাবনা, ঐতিহ্য ও উন্নয়নের প্রতীক হয়ে হায়দারগঞ্জ আজ রায়পুরের গর্ব।

দেশ জার্নাল বাংলাদেশ সংবিধান ও জনমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই ধর্ম ও রাষ্ট্রবিরোধী এবং উষ্কানীমূলক কোনো মন্তব্য না করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হলো।

[TheChamp-FB-Comments]

----- সংশ্লিষ্ট সংবাদ -----